কৃষি-খাদ্য-মৎস্য খাতে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকার বরাদ্দ
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রান্তিক কৃষকের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেয়া, খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা, কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও বাণিজ্যিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদন ও রফতানি বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে একগুচ্ছ নতুন কর্মসূচি ও আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার। নতুন বাজেটে ১০০ উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের হাতে ‘কৃষক কার্ড’ তুলে দেয়ার পাশাপাশি ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য নগদ সহায়তা, কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ, উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ৩ হাজার কোটি টাকার পুনর্ভরণ (রিফাইন্যান্স) স্কিম, কৃষিপণ্যে উৎসে কর কমানো, সার ও কীটনাশকে কর অব্যাহতি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বিমা ও ভর্তুকিসহ নানা উদ্যোগের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট উত্থাপিত হয়। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন অর্থবছরের জন্য মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন। এর মধ্যে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
৩ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা বরাদ্ধ বাড়ানোর প্রস্তাব :
কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সম্মিলিত বরাদ্দ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৩৫ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৬৮ শতাংশ), যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ৩৮ হাজার ২৫৯ কোটি টাকায় (জিডিপির ০.৬৩ শতাংশ) উন্নীত হয়। এবং চলমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত বরাদ্দ দেয়া হয় ৩৭ হাজার ১২৬ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৬১ শতাংশ)। নতুন অর্থবছরে আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ৬ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়িয়ে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জিডিপির ০.৬৩ শতাংশ।
কৃষক কার্ডে নগদ সহায়তা, এক ছাতার নিচে সরকারি সেবা :
সরকারের ঘোষণায় বলা হয়েছে, কৃষিকে জাতীয় সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি ইতোমধ্যে চালু করা হয়েছে। চলতি বছরের পহেলা বৈশাখ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির আওতায় আগামী অর্থবছরে ১০০টি উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে কার্ড দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষক, মৎস্যচাষি, প্রাণিসম্পদ খামারি ও লবণচাষিকে এ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক বছরে একবার ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা পাবেন। এজন্য বাজেটে ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু নগদ সহায়তার মাধ্যম নয়; বরং ভর্তুকি, সহজ ঋণ, বিমা, কৃষি উপকরণ বিতরণ এবং বিভিন্ন প্রণোদনা কার্যক্রমকে কৃষক ডাটাবেজের মাধ্যমে কার্যকরভাবে পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
উত্তরবঙ্গে ৩ হাজার কোটি টাকার কৃষি হাব:
নতুন অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ৩ হাজার কোটি টাকার পুনর্ভরণ স্কিম ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজের আওতাধীন এ তহবিলের ঋণে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে। ফলে কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ পাবেন এবং বাণিজ্যিক কৃষির প্রসার ঘটবে বলে আশা করছে সরকার।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কোল্ড চেইন ও গবেষণায় নতুন গুরুত্ব:
বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে আরও জোরদার করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষি উপকরণের দাম বাড়লেও ভর্তুকি মূল্যে সার সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ দেওয়া হবে।
কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ, পচনশীল পণ্যের জন্য কোল্ড স্টোরেজ ও কোল্ড চেইন সম্প্রসারণ, বরেন্দ্র অঞ্চলে আমচাষিদের জন্য বিশেষ হিমাগার নির্মাণ এবং আধুনিক সংরক্ষণাগার ও প্যাকেজিং সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি উপকরণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় কৃষক ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ‘স্বনির্ভর খাল খনন কর্মসূচি’ পুনরায় চালু করে কৃষি মন্ত্রণালয়কে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। সৌরশক্তিচালিত সেচ পাম্প ও ডাগওয়েল স্থাপন, ড্রিপ ইরিগেশন ও একুইফার রিচার্জ প্রযুক্তির সম্প্রসারণের পাশাপাশি জলবায়ু সহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবন এবং তরুণদের জন্য ‘এগ্রোপ্রেনারশিপ স্টার্ট-আপ নীতিমালা’ ও ‘কৃষি সমবায় নীতিমালা’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
কর-শুল্ক ছাড়ে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা
নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের বাজারে স্বস্তি আনতে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল ও বিভিন্ন বীজের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ বা ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া কৃষিকাজে ব্যবহৃত সব ধরনের সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ের ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট এবং কীটনাশকের আমদানি পর্যায়ের ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব রয়েছে। স্থানীয়ভাবে কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনে ব্যবহৃত ৩৬টি কাঁচামালের ভ্যাট শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ‘জিঙ্ক সালফেট’ উৎপাদনের জন্য ‘জিঙ্ক অ্যাশ’ আমদানির শুল্কও সম্পূর্ণ মওকুফের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে শূন্য শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত নতুন তিনটি কাঁচামালেও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তায় সংগ্রহ বাড়ানো, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় জোর:
সরকারি খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ২৩ দশমিক ১৬ লাখ মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে ২৪ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৫৫ লাখ পরিবারকে বছরে ছয় মাস প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়া হবে। সারা দেশে এক হাজারের বেশি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে চাল ও আটা সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে ৪১৯ উপজেলায় অতিরিক্ত ওএমএস কার্যক্রমের আওতায় ৩০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করা হবে। স্থানীয় বীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনে ১০ বছরের জন্য বিশেষ কর অব্যাহতি এবং শিশু খাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
সুনীল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে উৎপাদন:
আগামী অর্থবছরে ৫৬ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। সুনীল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে মৎস্য রফতানি আয় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গভীর সমুদ্রে টুনা ও পেলাজিক মাছ আহরণ, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ সম্প্রসারণ, কুয়াকাটা ও সলিমপুরকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা এবং মাতারবাড়িতে আধুনিক মৎস্য বন্দর স্থাপনের উদ্যোগও রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ খাতে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গোট পক্সের ভ্যাকসিন মাঠপর্যায়ে সরবরাহ, উপজেলাভিত্তিক প্রাণীর ওষুধ নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ ফিড উৎপাদন এবং গবাদিপশু পালনকারীদের জন্য ভর্তুকি, সহজ ঋণ, বিমা ও বাজারজাতকরণ সুবিধা সম্প্রসারণের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাদেরও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।