বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ ব্যক্তি সবচেয়ে সম্পদশালী। তাদের সম্পদের পরিমাণ মোট জনসংখ্যার ব্যক্তিগত সম্পত্তির ৭৫ ভাগ। এমন তথ্য উঠে এসেছে ‘বৈশ্বিক অসমতা প্রতিবেদন ২০২৬’-এ।
আয়ের দিক থেকে বিবেচনা করলে ৫০ শতাংশ মানুষের ঘরে যায় মোট আয়কৃত অর্থের ৯০ শতাংশ। বাকি ৫০ শতাংশ পায় ১০ শতাংশের মতো।
২০১৮ সাল থেকে প্রতি বছর সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ২০২৬ সালের সংস্করণটি এমন সময়ে প্রকাশ হলো, যখন বিশ্বের অনেক মানুষের জীবনমান স্থবির হয়ে আছে। বিপরীতে সম্পদ ও ক্ষমতা ক্রমেই গুটিকয়েক মানুষের হাতে যাচ্ছে।
এখানে উল্লেখ্য, সম্পদ ও আয়ের স্তর সব সময় এক রকম হয় না। সর্বোচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি মানেই সর্বোচ্চ আয়কারী নন। সম্পদ বলতে বোঝানো হয় একজন ব্যক্তির সব সম্পদের মোট মূল্য। যেমন- সঞ্চয়, বিনিয়োগ বা সম্পত্তি। কর কর্তনের আগের অবস্থা বিবেচনায় আয় পরিমাপ করা হয়। এর আওতায় পেনশন ও বেকারত্ব বীমাও পড়ে।
অঞ্চল ভেদে সম্পদ-আয়ের বৈষম্য
বিশ্বজুড়ে সম্পদ ও আয়ের বণ্টন একরকম নয়। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে ওঠে ব্যক্তির জন্মস্থান। যা নির্ধারণ করে ব্যক্তি কত সম্পদের মালিক ও কত আয় করতে পারবেন। অঞ্চল ভেদে আলাদা করলেও একেক দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত ও অনুন্নত হয়। তাই অসমতার প্রতিবেদনে সম্পদ ও আয়ের গড় হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
উত্তর আমেরিকা এবং ওশেনিয়া মহাদেশের গড় সম্পদ একত্রিত করে দেখা গেছে, এটি বৈশ্বিক গড়ের ৩৩৮ শতাংশ। সে বিবেচনায় এই দুই মহাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ধনী অঞ্চল। এখানকার বাসিন্দাদের গড় আয় বৈশ্বিক গড় আয়ের ২৯০ শতাংশ। অর্থ্যাৎ, সবচেয়ে বেশি আয়কারী ব্যক্তিরা বসবাস করেন উত্তর আমেরিকা ও ওশেনিয়ায়।
পরের অবস্থানে আছে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়া। বৈশ্বিক গড় আয়ের বেশ নিচে আছে আফ্রিকার সাব-সাহারা, দক্ষিণ এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল।
কোন দেশে আয়ের বৈষম্য বেশি
বিশ্বে আয়ের বৈষম্য সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ অফ্রিকায়। যেখানে ১০ শতাংশ ব্যক্তি মোট আয়ের ৬৬ শতাংশ আয় করেন। আর নিচের সারির মানুষের আয় মাত্র ৬ শতাংশ। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিল, মেক্সিকো, চিলি ও কলম্বিয়াতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে।
তবে ইউরোপের দেশগুলোতে সুষম অবস্থা আছে। সুইডেন ও নরওয়েতে ৫০ শতাংশ ব্যক্তি মোট আয়ের ২৫ শতাংশ পান। আর শীর্ষ ১০ শতাংশের আয় ৩০ শতাংশ। উন্নত অর্থনীতির দেশ যেমন- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, জাপান ও যুক্তরাজ্যে শীর্ষ ১০ শতাংশ ব্যক্তির আয় ৩৩-৪৭ শতাংশের মধ্যে। আর নিচের সারির ব্যক্তিদের আয় ১৬ থেকে ২১ শতাংশ।
এশিয়ায় আয়ের বণ্টনের ক্ষেত্রে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশ ও চীন তুলনামূলকভাবে সুষম। বাংলাদেশে শীর্ষ ১০ শতাংশ ব্যক্তির আয় মোট আয়ের ৪১ শতাংশ। মাঝামাঝি স্তরে থাকা ৪০ শতাংশ ব্যক্তির আয় ৪০% এবং ৫০ শতাংশ মানুষের আয় ১৯%। ভারত, থাইল্যান্ড ও তুরস্কে শীর্ষ ১০ শতাংশ আয়কারীর ঘরে যায় মোট আয়ের অর্ধেকের বেশি।
কোন দেশে সম্পদের বৈষম্য বেশি
এ তালিকায়ও শীর্ষে আছে দক্ষিণ আফ্রিকা। শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের নিয়ন্ত্রণে আছে মোট ব্যক্তিগত সম্পদের ৮৫ শতাংশ। আর ৫০ শতাংশ মানুষের ঋণ তাদের সম্পদের তুলনায় বেশি।
রাশিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও কলম্বিয়াতেও একই রকম চিত্র দেখা যায়। শীর্ষ সম্পদশালীরা ৭০% বা এর বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে। ইউরোপের দেশগুলো- যেমন ইতালি, ডেনমার্ক, নরওয়ে ও নেদারল্যান্ডস তুলনামূলকভাবে সুষম। এখানে মধ্যম আয়ের ৪০ শতাংশের সম্পদ প্রায় ৪৫ শতাংশ।
অর্থনৈতিকভাবে ধনী দেশগুলো যেমন- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানেও সমতা নেই। শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষ মোট সম্পদের অর্ধেকের বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে। আর নিচের ৫০ শতাংশ মানুষ পায় মাত্র ১-৫ শতাংশ।
এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য দেখা যায়। শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষ নিয়ন্ত্রণ করছে প্রায় ৬৫-৬৮ শতাংশ সম্পদ। বাংলাদেশে মোট ব্যক্তিগত সম্পদের ৫৮ শতাংশ ১০% ব্যক্তির হাতে। ৪০ শতাংশ মানুষের হাতে আছে ৩৭% এবং ৫০ শতাংশ মানুষের কাছে সম্পদের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ।
মন্তব্য করুন