কৃষি সময়
প্রকাশ : Dec 31, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা অবিলম্বে বাতিল দাবি জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
জলবায়ু সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উন্নয়ন পথ থেকে সরে আসার স্পষ্ট আহ্বান জানালেন দেশের জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী ও দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (আইইপিএমপি) অবিলম্বে বাতিল, সব নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্প বন্ধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত ও ন্যায়ভিত্তিক রূপান্তরের দাবি জানিয়ে ৮ দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে তৃতীয় জলবায়ু ন্যায্যতা সমাবেশ ২০২৫। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইইপিএমপি বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভর কয়লা ও এলএনজি ব্যবস্থার মধ্যে আটকে দিচ্ছে, যা জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।

আজ রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শেকৃবি) অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এ সমাবেশের সমাপনী অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেয়া হয়। সমাবেশে উপকূল, হাওর, চর ও বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে আসা জেলে, কৃষক, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নারী, যুব, পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীসহ মোট ১ হাজার ৯৪৫ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে জলবায়ু পরিবর্তন, শিল্পায়ন ও জীবাশ্ম জ্বালানির প্রভাব তুলে ধরেন। 

গতকাল শনিবার শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী সমাবেশের গতকাল সমাপনী দিনে প্রকাশিত ঘোষণাপত্রে বলা হয়, আইইপিএমপি বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভর কয়লা ও এলএনজি ব্যবস্থার মধ্যে আটকে দিচ্ছে, যা একদিকে জলবায়ু সংকট তীব্র করছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি বহুগুণ বাড়াচ্ছে। 

সমাপনী অনুষ্ঠানে ৮ দফা ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করেন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সদস্য সচিব শরীফ জামিল। এতে সভাপতিত্ব করেন জলবায়ু ন্যায্যতা সমাবেশ-২০২৫-এর আহ্বায়ক ড. মুজিবুর রহমান। ঘোষণাপত্রে আইইপিএমপির পাশাপাশি মহেশখালী-মাতারবাড়ী উন্নয়ন উদ্যোগ (এমআইডিআই)-এর মতো মেগা শিল্প পরিকল্পনাগুলোকে বাংলাদেশের জলবায়ু বাস্তবতার সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, এসব পরিকল্পনা কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে এবং জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। 

শরীফ জামিল বলেন, আইইপিএমপি ও এমআইডিআই পরিকল্পনাগুলো ব্যয়বহুল আমদানিকৃত কয়লা ও এলএনজি নির্ভরতা বাড়াচ্ছে, অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বোঝা জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে এবং জনগণকেন্দ্রিক নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক ভবিষ্যৎকে দুর্বল করছে। তিনি বলেন, বিদ্যমান বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে অলস কেন্দ্রগুলোর জন্য বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হচ্ছে, যা স্পষ্টতই জনস্বার্থবিরোধী।
সমাবেশ থেকে সব নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ, আইইপিএমপি ও এমআইডিআই মাস্টারপ্ল্যান বাতিল এবং বিদ্যমান কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক প্রকল্প ধাপে ধাপে বন্ধের জন্য সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বন্ধ করে ‘বিদ্যুৎ নেই, পেমেন্ট নেই’ নীতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। 

ঘোষণাপত্রে সরকারকে জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনা পুনর্গঠন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এতে ব্যাটারি সংরক্ষণসহ সৌরবিদ্যুৎ, স্মার্ট গ্রিড উন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত জাতীয় বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। প্রতিনিধিরা বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন কোনোভাবেই ঋণ হতে পারে না; এটি শিল্পোন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক নিঃসরণের দায় হিসেবে অনুদান ও ক্ষতিপূরণ আকারে দিতে হবে। দ্রুত লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড কার্যকর করা এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর দাবিও তোলা হয়।

সমাবেশে নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, বায়ু ও পানি দূষণ, বন উজাড় এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির সম্প্রসারণ ও অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এসব সংকটকে আরও তীব্র করছে এবং মানুষের জীবিকা ও পরিবেশ ধ্বংস করছে। সুন্দরবনসহ ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, দূষিত নদী পুনরুদ্ধার, শিল্প দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রকল্পে ভূমিদখল ও দুর্নীতির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবিও উঠে আসে।

ফসিল ফুয়েল নন-প্রোলিফারেশন ট্রিটি ইনিশিয়েটিভের কৌশলগত উপদেষ্টা হারজিৎ সিং বলেন, জলবায়ু ন্যায্যতা কেবল রাষ্ট্রের মধ্যে নয়, রাষ্ট্রের ভেতরের বৈষম্য ও বেছে নেয়া উন্নয়ন মডেলের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তিনি গ্লোবাল নর্থের ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন পথ প্রত্যাখ্যান করে মানুষ ও প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানান এবং জাতীয় ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।

সমাবেশের সহ-আহ্বায়ক এম এস সিদ্দিকী বলেন, রামপাল প্রকল্পসহ যেসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আগে আপত্তি জানানো হয়েছিল, সেগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব এখন স্পষ্ট। তরুণদের সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অর্থবহভাবে যুক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তৃতীয় জলবায়ু ন্যায্যতা সমাবেশ-২০২৫ আয়োজন করে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)। জাতীয় সহ-আয়োজকদের মধ্যে ছিল ব্রাইটার্স, ব্রতী, সিপিআরডি, কোস্ট ফাউন্ডেশন, ক্রেসল, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, ওএবি ফাউন্ডেশন ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে ছিল এপিএমডিডি, ফসিল ফুয়েল নন-প্রোলিফারেশন ট্রিটি ইনিশিয়েটিভ, ফসিল ফ্রি জাপান ও এলডিসি ওয়াচসহ বিভিন্ন সংগঠন। আয়োজকেরা জানান, ৮ দফা এই জনগণের ঘোষণা সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেয়া হবে এবং এটি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর পরিকল্পনার বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যুগের পর যুগ যেখানে যুগলজীবনের শুরু

1

প্রতিযোগী দেশের সাথে টিকে থাকা দায় দেশীয় স্পিনিং শিল্পের

2

কোনো সভ্য দেশে কূটনৈতিক স্থাপনায় এ ধরনের হামলা হতে পারে না

3

বিভেদের জেরে ব্রি’র মহাপরিচালকের দায়িত্বে অতিরিক্ত সচিব

4

অপুষ্টি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

5

শ্রীলঙ্কার পেরাদেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্ক এগ্রিকালচার সেন্ট

6

সমুদ্রে ওভারফিশিংয়ের ঝুঁকি বেড়েছে

7

বৈজ্ঞানিকভাবে মাছ চাষ খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি

8

করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর

9

রেড চিটাগাং ক্যাটল জাত সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি

10

কেআইবি ভবিষ্যতে সকল কৃষিবিদের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে

11

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে জানলেন তিনি ‘মৃত’

12

অবৈধ ইটভাটায় যাচ্ছে কৃষি জমির উর্বর মাটি

13

সীড এসোসিয়েশনের নতুন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ

14

বিষমুক্ত তরমুজ চাষে সফল উদ্যোক্তা শাহজাহান

15

বিদেশ নয়, এটা বাংলাদেশ,সমতলেই এখন সফল কমলা চাষ

16

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত দেশের অর্থনীতির মূলভিত্তি

17

ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ

18

বন্ধ হচ্ছে এক দিনের বাচ্চা আমদানি, পক্ষে বিপক্ষে মত

19

বাজারে সবজিরমূল্য চড়া, দাম পাচ্ছেন না কৃষক

20