কৃষি সময়
প্রকাশ : Feb 28, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

অপুষ্টি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
অপুষ্টি ও পুষ্টিহীনতার নীরব সংকটে যখন দক্ষিণ এশিয়ার বড় একটি জনগোষ্ঠী ঝুঁকিতে, তখন সবার জন্য প্রোটিনের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান নিয়ে বাংলাদেশেও পালিত হলো বিশ্ব প্রোটিন দিবস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ-সবল ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে প্রোটিনসমৃদ্ধ সুষম খাদ্যের বিকল্প নেই; এ বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় পরিমণ্ডল ও গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে।
 
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে দিবসটি উদযাপন করে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) ও ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিল (ইউএসএসইসি)। এ উপলক্ষে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শনিবার রাজধানীর ঢাকা রিজেন্সি হোটেল-এ এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের খ্যাতিমান পুষ্টিবিদ, চিকিৎসক, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
 
আলোচনায় বক্তারা বলেন, আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই শিশু, কিশোর-কিশোরী ও মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করা জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। প্রোটিন গ্রহণ বাড়াতে পারলে শারীরিক বৃদ্ধি, মেধা বিকাশ ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হবে—যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
 
বিপিআইসিসি’র ট্রেজারার সিরাজুল হক স্বাগত বক্তব্যে বলেন, প্রোটিন বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষক এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, অন্যান্য অনেক প্রোটিন উৎসের তুলনায় পোলট্রি থেকে উৎপাদিত প্রোটিন তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য। শিশুদের প্রোটিন গ্রহণ বাড়ানো ছাড়া সুস্থ ও উৎপাদনশীল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এ ধরনের উদ্যোগে ইউএসএসইসি’র সহযোগিতার প্রশংসা করেন তিনি।
 
ইউএসএসইসি’র বাংলাদেশ মার্কেট লিড খাবিবুর রহমান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় এখনও ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। পুষ্টি সূচকে উন্নতি ঘটাতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্র বদলে যেতে পারে। তিনি জানান, প্রোটিন অধিকার নিশ্চিত করতে তাদের প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাপী কাজ করছে এবং বাংলাদেশেও এ প্রচেষ্টা জোরদার থাকবে।
 
এভারকেয়ার হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ তামান্না চৌধুরী বলেন, আমাদের পরিবারগুলো এখনও ভাতনির্ভর খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত। কিন্তু একটি সুষম খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন অন্তত একটি নির্ভরযোগ্য প্রোটিন উৎস থাকা জরুরি—তা ডিম, মাছ বা মাংস যাই হোক না কেন। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সুষম খাদ্যের ধারণা দেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ডিম ও মুরগি নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেকেই মনে করেন হার্টের রোগীদের ডিম খাওয়া উচিত নয় বা ডিমের কোলেস্টরল ক্ষতিকর। বাস্তবে ডিমে থাকা কোলেস্টরল শরীরের জন্য উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে। সামান্য খাদ্য পরিকল্পনার মাধ্যমে বাড়তি খরচ ছাড়াই পরিবারগুলো প্রোটিন ঘাটতি মোকাবিলা করতে পারে।
 
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের সহকারী অধ্যাপক ও কার্ডিওলজিস্ট ডা. এ.জেড.এম. আহসান উল্লাহ বলেন, প্রোটিনের ঘাটতি নিঃশব্দে পরবর্তী প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। খর্বাকৃতি, রক্তশূন্যতা ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা—এসবই অপুষ্টির লক্ষণ। সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।
 
প্রাইমারি টিচার্স ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট ঢাকার সুপারিনটেনডেন্ট মো. ওমর আলী বলেন, শিক্ষকরা শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। একজন শিশু যদি স্কুলে প্রোটিনএর গুরুত্ব শেখে, সে সেই বার্তা পরিবারেও পৌঁছে দিতে পারে—এভাবেই সচেতনতার বিস্তার ঘটে।
 
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনিম্যাল সায়েন্স ও ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরকেও এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শুক্রবারের খুতবায় সংক্ষিপ্ত স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বার্তা অন্তর্ভুক্ত করা গেলে তা ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব।
 
সেমিনারের উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা একমত হন—প্রোটিন সচেতনতা কেবল একটি দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচি নয়; বরং এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম সম্মিলিতভাবে কাজ করলে শিশু পুষ্টির ঘাটতি নিরসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টিমুক্ত ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়তে এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতন খাদ্যাভ্যাস এবং সবার জন্য প্রোটিনের অধিকার নিশ্চিত করার দৃঢ় অঙ্গীকার। 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাশ্রয়ীমূল্যে সার সরবরাহে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ : সংসদে

1

এফ.আর মল্লিকের ইন্তেকাল,সীড এসোসিয়েশনের শোক

2

রফতানিমুখী বাণিজ্যিক কৃষি : উন্নয়ন এবং চ্যালেঞ্জ

3

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন

4

অপুষ্টি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

5

বাংলাদেশ ডেইরি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদের প্রথম সভা

6

কেআইবি ভবিষ্যতে সকল কৃষিবিদের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে

7

গলদা -বাগদা চিংড়ি সংরক্ষণ করে পরিকল্পিত উৎপাদন বাড়াতে হবে

8

চরের কৃষকের লড়াই ও সম্ভাবনার গল্প

9

কৃষি সচিব হিসেবে যোগদান করেছেন রফিকুল ই মোহামেদ

10

‘নবীর ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়বিচারের আলোকে দেশ পরিচালনার সর্

11

কোনো সভ্য দেশে কূটনৈতিক স্থাপনায় এ ধরনের হামলা হতে পারে না

12

আইএসও সার্টিফিকেশন অর্জন করলো সিনট্যাক্স গ্লোবাল

13

চুক্তিতে কৃষিসচিব থাকছেন ওয়াহিদা আক্তার

14

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত দেশের অর্থনীতির মূলভিত্তি

15

বাজারে সবজিরমূল্য চড়া, দাম পাচ্ছেন না কৃষক

16

সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের আহ্বান ডিআরইউয়ের

17

অন্ধকারে ৭২১ কোটির ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ কার্যক্রম

18

হামাস জিম্মিদের তালিকা না দেওয়া পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হ

19

ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন এক কথায় অবাস্তব এবং অসম্ভব: সারজিস আ

20