কৃষি সময়
প্রকাশ : Jun 19, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

জাতীয় ফলমেলায় শৈশবের স্বাদ খুঁজছেন দর্শনার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় গ্রামের পথঘাট, বাড়ির আঙিনা কিংবা পুকুরপাড়ে অবহেলায় জন্মানো আতা, শরিফা, করমচা, কাউফল, গাব কিংবা ডেউয়ার মতো দেশি ফল ছিল বাংলার গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু নগরায়ন, কৃষিজমি সংকোচন, জলবায়ু পরিবর্তন ও বাণিজ্যিক চাষের প্রসারে এসব ফলের অনেকই এখন বিলুপ্তির পথে। হারিয়ে যেতে বসা সেই দেশি ফলগুলোকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে এবং চাষাবাদ সম্প্রসারণে কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষকদের নানা উদ্যোগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে রাজধানীতে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী জাতীয় ফলমেলা-২০২৬-এ। মেলায় এসে অনেক দর্শনার্থী যেন ফিরে যাচ্ছেন শৈশবের স্মৃতিমাখা সেই গ্রামীণ বাংলায়। ‘করব মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করব বারো মাস’ প্রতিপাদ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) চত্বরে শুরু হয়েছে জাতীয় ফলমেলা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং কৃষি তথ্য সার্ভিস যৌথভাবে এ মেলার আয়োজন করেছে।

মেলায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে দেশি-বিদেশি শতাধিক ফলের সমারোহ। কোথাও সাজানো রয়েছে পরিচিত আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, আনারস ও ড্রাগন ফল। আবার কিছু স্টলে দেখা মিলছে এমন সব ফলের, যেগুলোর নামও অনেক তরুণ-তরুণীর কাছে অপরিচিত।

সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর ভিড় দেখা গেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্টলে। সেখানে একসঙ্গে প্রদর্শন করা হয়েছে অর্ধশতাধিক বিলুপ্তপ্রায় ও অপ্রচলিত দেশি ফল। কাউফল, করমচা, ডেউয়া, আঁশফল, গাব, যজ্ঞডুমুর, চাম্বুল, আতা, চালতা, অরবরই, বিলিম্বি, শরিফা, সাতকরা, তৈকর, ডেফল, লুকলুকি ও মুনিয়ার মতো ফল দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

অনেকেই ফলগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, সন্তানদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন কিংবা নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করছেন। আব্দুল বাছেত নামের এক দর্শনার্থী বলেন, “ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে ডেউয়া, করমচা আর গাব খেয়েছি। এখন শহরে থাকায় অনেক বছর এসব ফল চোখেই দেখিনি। মেলায় এসে যেন হারানো দিনগুলো ফিরে পেলাম।”

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় এসব ফল প্রাকৃতিকভাবে জন্মালেও বাণিজ্যিক মূল্য কম থাকায় ধীরে ধীরে সেগুলোর গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি নগরায়ন ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রজাতির বিস্তারও কমে গেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মাধ্যমে অপ্রচলিত ফলের চাষে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব ফলের চারা বিতরণ ও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার কাজও চলছে।

মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেন, একসময় যেসব ফল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো, বর্তমানে তার অনেকগুলোই দেশে সফলভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। কৃষি গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৃষকদের প্রচেষ্টার ফলে ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, দেশীয় ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। বিলুপ্তপ্রায় ফল সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সেগুলো পরিচিত করে তুলতে জাতীয় ফলমেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মেলায় অংশ নেওয়া কৃষি কর্মকর্তারা জানান, অপ্রচলিত দেশীয় ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলায় করমচা, আতা, শরিফা, বিলিম্বি ও অন্যান্য দেশি ফলের বাগান গড়ে উঠতে শুরু করেছে।

দর্শনার্থীদের মতে, শুধু প্রদর্শনী নয়, এসব ফলের চারা সহজলভ্য করা, বাজারজাতকরণে সহায়তা দেওয়া এবং গবেষণা জোরদার করা গেলে হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় ফল আবারও গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

তিন দিনব্যাপী এ জাতীয় ফলমেলা তাই শুধু ফল প্রদর্শনীর আয়োজন নয়; বরং বাংলাদেশের হারিয়ে যেতে বসা জীববৈচিত্র্য, খাদ্যঐতিহ্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতিকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সিরাজগঞ্জের সরিষাকেন্দ্রিক হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য

1

খায়রুল কবির খোকন বললেন, ‘তারেক রহমানই সরকার পতন আন্দোলনের মা

2

অগ্নিকাণ্ডের ৫ দিন পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ

3

জুনিয়র বিসিএস কর্মকর্তার ঘুষিতে রক্তাক্ত সিনিয়র কর্মকর্তা

4

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি

5

হাওরের ধান যথাসময়ে কাটতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে : কৃষ

6

রমজানে ১০ লাখ পরিবারকে সুলভমূল্যে প্রোটিন খাদ্য দেবে সরকার

7

সাংবাদিকদের দ্রুত অ্যাক্রিডিটেশন প্রদানের আহ্বান অনলাইন এডিট

8

দেশের ২৪ জেলায় বইছে শৈত্যপ্রবাহ,সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি

9

নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান

10

শ্রীলঙ্কার পেরাদেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্ক এগ্রিকালচার সেন্ট

11

পেঁয়াজ আমদানি অনুমতি আরও বাড়লো

12

বাকৃবি এগ্রি স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্সের সভাপতি খালিদ,সম্পাদক শ

13

আমাদের কাছে তিনি ছিলেন ‘লিজেন্ড’

14

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত দেশের অর্থনীতির মূলভিত্তি

15

অপুষ্টি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

16

ভারতের সঙ্গে কথা হবে চোখে চোখ রেখে

17

এআইইউবিতে চাকরি মেলা অনুষ্ঠিত

18

কিংস প্যালেসের পিজন স্কোয়ার-মানুষের সঙ্গে কবুতরের বন্ধুত্বপূ

19

সেন্টমার্টিন মাস্টার প্ল্যানে ট্যুরিজমের আগে সংরক্ষণকে গুরুত

20