বরিশাল সংবাদদাতা
একটি গাছেই ধরেছে ১০ ধরনের আম। এমন ব্যতিক্রমী উদ্ভাবন বাস্তবে রূপ দিয়েছে বরিশালের রহমতপুর হর্টিকালচার সেন্টার। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের আম একটি গাছে কলম সংযোজনের মাধ্যমে ফলিয়ে তারা ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে একই গাছে ১৫ থেকে ২০ জাতের আম ফলানোর লক্ষ্যেও কাজ চলছে।
বরিশালের রহমতপুর হর্টিকালচার সেন্টারে বর্তমানে একটি দেশি আমগাছে কলম সংযোজনের মাধ্যমে বিশ্বখ্যাত জাপানি মিয়াজাকি, থাইল্যান্ডের ন্যামডকমাই, রেড আইভরি, টকমাই, থ্রি টেস্ট, দেশীয় আম্রপালি, বারিভোগ, বারি-১১সহ মোট ১০ জাতের আমের ফলন নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব বহুজাতের চারা সাধারণ ক্রেতাদের কাছেও বিক্রি করা হচ্ছে এবং চারা পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।
হর্টিকালচার সেন্টারের সহকারী উদ্যান কর্মকর্তা মো. আবু বক্কর জানান, বর্তমানে ১০ জাতের আম সংযোজিত চারা পাওয়া যাচ্ছে। তবে গবেষণা ও কলম সংযোজন কার্যক্রমের মাধ্যমে এটিকে ১৫ থেকে ২০ জাত পর্যন্ত সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। বহুজাতের তালিকায় বারিভোগ, আম্রপালি, মিয়াজাকি, কাটিমন ও ব্যানানা জাতের আমও রয়েছে।
তিনি বলেন, একজন আগ্রহী ব্যক্তি চাইলে একটি গাছে নিজের পছন্দ অনুযায়ী একাধিক জাতের আম যুক্ত করতে পারবেন। ইতোমধ্যে বিষয়টি ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে এসব চারা সংগ্রহ করছেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যান তত্ত্ববিদ ফেরদোউস আরা মিতা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মানুষ আম খেলেও এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে অনেকের ধারণা সীমিত। আমে প্রচুর ভিটামিন ‘এ’ এবং কাঁচা আমে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। বড় আকারের একটি গাছ থেকে সীমিত ফল পাওয়ার পরিবর্তে উন্নত কলম প্রযুক্তির মাধ্যমে ছোট পরিসরে অধিক উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ছাদ বাগানেও এসব চারা সফলভাবে চাষ করা সম্ভব এবং একটি পরিবার একটি গাছ থেকেই সারা মৌসুমের আমের চাহিদা পূরণ করতে পারে।
বরিশাল হর্টিকালচার সেন্টার থেকে বছরে প্রায় আড়াই লাখ ফলদ গাছের চারা বিক্রি হয়। ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় দেড় লাখই বহুজাতের আমের চারা। এ কারণে প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শনার্থী ও ক্রেতারা এখানে ভিড় করছেন।
চারা কিনতে আসা রশিদ সিকদার বলেন, এক জায়গায় ৭৪ ধরনের আমের চারা এবং একটি গাছে ১০ জাতের আম দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের প্রযুক্তির আরও ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষ নিজেদের বাড়ির আঙিনায় এমন গাছ লাগাতে উৎসাহিত হন।
আরেক ক্রেতা মাহবুব হোসেন বলেন, চারা কেনার পাশাপাশি প্রতিটি চারার সঙ্গে পরিচর্যা বিষয়ক একটি গাইড বই দেওয়া হলে ক্রেতারা আরও বেশি উপকৃত হবেন।
হর্টিকালচার সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, বরিশালের মাটিতে ইতোমধ্যে বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন জাতসহ মোট ৭৪ জাতের আমের সফল ফলন নিশ্চিত হয়েছে। এসব জাতের সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় করতে আরও বড় পরিসরে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
বরিশাল হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক মো. অলিউল আলম বলেন, বিশ্বের অন্যতম দামি আম মিয়াজাকি এবং অত্যন্ত সুস্বাদু ন্যামডকমাই গত দুই বছর ধরে বরিশালে সফলভাবে ফলছে। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে কৃষকেরা এখান থেকে উচ্চফলনশীল ও উন্নত জাতের আমের চারা সংগ্রহ করতে পারছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় প্রতি বছর তিন হাজার ২৩৩ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয় এবং গড়ে প্রায় ৫২ হাজার ৭৩০ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বহুজাতের আমগাছের এই উদ্যোগ সফল হলে সীমিত জায়গায় অধিক বৈচিত্র্যময় ফল উৎপাদনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।