ব্রি ধান ১১৫ নিবন্ধন দিলো জাতীয় বীজ
বোর্ড
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের ভাতনির্ভর খাদ্যসংস্কৃতিতে
এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। চিরচেনা সাদা ভাতের পাতে এবার যুক্ত হচ্ছে স্বাস্থ্যগুণে
ভরপুর কালো চাল বা ব্ল্যাক রাইস। দীর্ঘ গবেষণার পর বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট
(ব্রি) উদ্ভাবন করেছে দেশের প্রথম উচ্চ ফলনশীল কালো চালের ধান—ব্রি
ধান ১১৫। পুষ্টি ও আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের যুগলবন্দিতে উদ্ভাবিত এই জাতকে কৃষিবিজ্ঞানীরা
দেখছেন শুধু একটি নতুন ধান নয়, বরং দেশের কৃষি, পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে
একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে।
সম্প্রতি জাতীয় বীজ বোর্ডের কারিগরি
কমিটির সভায় এই ধান নিবন্ধনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা জানান, প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতিতে
একটি নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনে সাধারণত ১২ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে। তবে ব্রি ধান ১১৫-এর
ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক অ্যান্থার কালচার প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে এই
সময়সীমা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে মাত্র চার থেকে পাঁচ বছরে। ব্রির বায়োটেকনোলজি বিভাগের
প্রধান বিজ্ঞানী ড. সাহানাজ সুলতানা এবং উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানী ড.
খন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলার নেতৃত্বে গবেষক দল জনপ্রিয় উচ্চ ফলনশীল জাত ব্রি ধান ২৮-এর
সঙ্গে কালো চালের আদি জাত ‘পাদি কুল’-এর সংকরায়ন
ঘটান। ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে দ্বিগুণ হ্যাপ্লয়েড গাছ তৈরি করে দ্রুতই
এই জাতকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনা সম্ভব হয়।
দীর্ঘ ব্রিডিং সাইকেল কমিয়ে এভাবে দ্রুত
জাত উদ্ভাবনের এই সাফল্যকে বিজ্ঞানীরা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে
বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টিসচেতনতার যুগে
এই ধানের গুরুত্ব আরও বেশি।
ব্রি ধান ১১৫-কে ‘মেডিসিন্যাল রাইস’
বা ঔষধি গুণসম্পন্ন চাল বলা হচ্ছে। সাধারণ সাদা চালে যেখানে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট প্রায়
অনুপস্থিত, সেখানে এই কালো চালের উপরের স্তরে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে সায়ানিডিন-৩-গ্লুকোসাইড
নামের শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। প্রতি ১০০ গ্রাম চালে প্রায় ৫৩৬.৬১ ইউনিট অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট
পাওয়া যায়, যা ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং বার্ধক্যজনিত ঝুঁকি কমাতে সহায়ক বলে জানিয়েছেন
বিজ্ঞানীরা।
এই চালে প্রতি কেজিতে প্রায় ১৪.৯৮ মিলিগ্রাম
ভিটামিন ই রয়েছে, যা ত্বক ও চোখের সুস্থতা বজায় রাখা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চালটির অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৩ শতাংশ হওয়ায় রান্না করা ভাত
ঝরঝরে হয়। ভিটামিন ই পানিতে দ্রবণীয় না হওয়ায় রান্নার পরও এর পুষ্টিগুণ অটুট থাকে।
এই চাল দিয়ে সাধারণ ভাতের পাশাপাশি পায়েস, পিঠা, কেক, সালাদ এমনকি পুষ্টিকর পানীয়ও
তৈরি করা সম্ভব।
২০২৪-২৫ রবি মৌসুমে দেশের ১০টি ভিন্ন
ভৌগোলিক অঞ্চলে ব্রি ধান ১১৫-এর মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা চালানো হয়। গাজীপুর, বরিশাল, যশোর,
ফেনী, রাজশাহী, বগুড়া, কুমিল্লা ও দিনাজপুর—এই আটটি
অঞ্চলে প্রস্তাবিত জাতটি বিদ্যমান জনপ্রিয় জাতগুলোর তুলনায় বেশি ফলন দিয়েছে। হেক্টরপ্রতি
গড় ফলন পাওয়া গেছে ৭.৪০ টন, যা চেকজাত ব্রি ধান ৮৬-এর গড় ফলন ৬.৯৮ টনের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে
বেশি। বোরো মৌসুমের ধান হওয়া সত্ত্বেও এর জীবনকাল মাত্র ১৩৭ দিন, যা কৃষকের সময় ও খরচ
সাশ্রয়ে সহায়ক হবে।
পূর্ণবয়স্ক গাছের গড় উচ্চতা প্রায় ১০০
সেন্টিমিটার। কাণ্ড শক্ত, পাতা গাঢ় সবুজ এবং শিষ পাকার সময়ও গাছ সবুজ থাকে। শক্ত কাণ্ড
ও খাড়া ডিগপাতার কারণে ঝড়-বাতাসেও এই ধান সহজে হেলে পড়ে না, যা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের
জন্য বাড়তি সুবিধা।
জাতীয় বীজ বোর্ডের সভায় এই ধানের বাণিজ্যিক
সম্ভাবনাও গুরুত্ব পায়। কিছু বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছিলেন—সাধারণ
মানুষ সাদা চালের পরিবর্তে কালো চাল গ্রহণ করবে কি না। এর জবাবে ব্রির বিজ্ঞানীরা জানান,
মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় কৃষকদের মধ্যে এই ধান ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
ধান বিশেষজ্ঞ ড. খন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলা
বলেন, এই ধানে আদি দেশি কালো জাতের মতো অতিরিক্ত তীব্র ঘ্রাণ নেই, ফলে সাধারণ ভাতের
বিকল্প হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা বেশি হবে। তাঁর মতে, এটি শুধু পেট ভরানোর চাল নয়; বরং
একটি প্রিমিয়াম পুষ্টিকর পণ্য হিসেবে বাজারে বিক্রির বড় সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষ অন্যান্য
চালের সঙ্গে মিশিয়েও এই চাল খেতে পারবে, যদিও এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে
তিনি মনে করেন।
জাতীয় বীজ বোর্ডের কারিগরি কমিটি ব্রি
ধান ১১৫-কে বোরো মৌসুমের ইনব্রিড জাত হিসেবে ছাড়করণের সুপারিশ করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত অনুমোদন মিললেই এই জাত কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
তাঁদের আশা, এই ধান প্রবর্তনের মাধ্যমে দেশে ধান উৎপাদনে বৈচিত্র্য আসবে এবং মানুষের
অনুপুষ্টির ঘাটতি পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্য করুন