কৃষি সময়
প্রকাশ : Mar 11, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

বাধ্যতামূলক অবসরে সচিব মিয়ান কৃষিতে রেখে গেছেন নিজস্ব বলয়

রুটিন দায়িত্বে নাসির- উদ-দৌলা

 

নিজস্ব প্রতিবেদক

অবশেষে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। গতকাল রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। সরকার জনস্বার্থে তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে অবসর প্রদান করা প্রয়োজন। এ প্রেক্ষিতে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং ৪৫ ধারায় এই কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়।

এদিকে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের রুটিন দায়িত্ব পেয়েছেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাসির- উদ-দৌলা। সোমবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক  অফিস আদেশে এ দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইং এবং বিপণন অধিদফতরের  মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।


কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চব্বিশের পাঁচ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে এই কর্মকর্তা কৃষি মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর পর থেকেই অধিনস্থ দপ্তরগুলো পরিচালনায় অদক্ষতা, ভুল নীতি গ্রহণ, দপ্তরগুলোতে কর্মকর্তাদের মধ্যে দলাদলি তৈরি করা, সিন্ডিকেট ভাঙ্গার কথা বলে নতুন সিন্ডিকেট তৈরি, প্রয়োজনীয় প্রকল্প বন্ধ করা, অদক্ষ কর্মকর্তাকে বড় প্রকল্পের দায়িত্ব প্রদানের মত কাজগুলো করেছেন এমদাদ উল্লাহ মিয়ান।


এসব কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে একাধিকবার এই সচিবকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয় নিয়ে প্রশাসনে ব্যপক আলোচনা ছিল। কিন্তু একাধিক উপদেষ্টার সুপারিশের কল্যানে তাকে চেয়ার ছাড়তে হয়নি। বরং সে সময়গুলোতে আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেন এ কর্মকর্তা। এবারও নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই নানাভাবে চেষ্টা করছিলেন চেয়ার রক্ষার, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। 


কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ এর ১৪ আগষ্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে যোগদান করেন এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। এর পরপরই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে একটি নির্দেশনা পাঠানো হয় সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের কাছে। চিঠিতে বলা হয়, কিছু কর্মচারির প্রাধিকার বহির্ভূত গাড়ি ব্যবহারের কারণে জনপ্রশাসনে বিশৃংখলা ও আর্থিক অপচয়ের কারণ ঘটছে। অন্যদিকে নৈতিকতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে সমাজে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারিদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারের বরাদ্দ করা গাড়ি নিজে ব্যবহার না করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচার কম্পিটিটিভনেস প্রকল্পের একটি জীপ গাড়ি ব্যবহার শুরু করেন। ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-৩০৩৬ নম্বরের গাড়িটিতে চড়ে শেষদিনও অফিস করেছেন এই কর্মকর্তা।


জানা যায়, তিনি সচিব হিসেবে যোগদানের মাস তিনেক পরই শুরু হয় বোরো মৌসুম। সে সময় সারের সরবরাহ সংকটের অভিযোগ উঠে। সারাদেশের কৃষককে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ইউরিয়া- নন ইউরিয়া সার কিনতে হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। শুধু মিডিয়াতে বলেছেন, সারের কোন সংকট নেই। শুধু সেই বোরো মৌসুমই নয়, এর পরের আমন এবং এবং চলতি বোরো মৌসুমেও একইভাবে কৃষক বেশি দাম দিয়ে সার কিনছেন। অথচ তিনি সারের দাম কমানোর বিষয়ে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।


তিনি সংশ্লিষ্ট ডিলারদের সঙ্গে কোন আলোচনা ছাড়াই এই নীতিমালা তৈরি করেছিলেন। ডিলারদের দাবি ছিল, যাতে নীতিমালাটি বাস্তবায়ন করা হয় মৌসুম শেষে। কিন্তু তিনি জোর করে এই বোরো মৌসুমের ভিতরেই নীতিমালা বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। ডিলারদের মধ্যে তৈরি হওয়া অস্থিরতার একটা প্রভাব পড়েছে সারের দামে।


অভিযোগ রয়েছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক এই সচিব গত আমন মৌসুমে ইচ্ছাকৃতভাবে সারের সরবরাহ সংকট তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। প্রতি বছর যে সময়ে নন ইউরিয়া সার আমদানি করা হয়, তারও দুই মাস পরে সাড়ে ৯ লাখ টন নন ইউরিয়া সার আমদানির দরপত্র দিয়েছিলেন। আবার দরপত্র দিলেও সব আয়োজন ছিল পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়া আমদানির সুযোগ দেওয়া। শুধু সময় ক্ষেপনই নয়,  ব্যপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে সিন্ডিকেট তৈরির অভিযোগ। কারণ একজন ব্যবসায়ীকে একই কার্যাদেশে দুটি দেশ থেকে সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়- যা ছিল নীতিমালার পরিপন্থি। সিন্ডিকেট ভাঙ্গার কথা বললেও বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যপক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে এককভাবে বড় অংকের সার আমদানির সুযোগ দিয়েছিলেন এই কর্মকর্তা।


অভিযোগ রয়েছে, একদিকে সিন্ডিকেট করে একজনকে বেশি আমদানির সুযোগ দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যাতে করে মৌসুমে সার সংকটের শঙ্কা তৈরি হয়। এছাড়া দেরিতে সার আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামও বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রায় হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল সরকার।


কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, একটা সিন্ডিকেট তৈরির জন্য সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ উইংটি সচিব নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের বসিয়েছিলেন। সচিব নিজেই বঙ্গবন্ধু জন্মশত বার্ষিকি উতযাপন কমিটির সদস্য সচিব থাকায় গুরুত্বপূর্ণ এই উইং এর কর্মকর্তা পছন্দের ক্ষেত্রেও আওয়ামী ঘণিষ্টতাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন, তাও আবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও। যে কারণে অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমামকে এই উইং এর প্রধান করেন, যিনি সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের একান্ত সচিব ছিলেন। এছাড়া এ বিভাগে যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্বে নিয়ে আসা হয় খোরশেদ আলমকে, যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভৈরবের ইউএনও এবং নাজমুল হাসান পাপনের ঘণিষ্ঠ বলে প্রশাসনে আলোচনা রয়েছে। একইভাবে সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের একান্ত সচিব মনিরুজ্জামনকেও এই বিভাগে নিয়ে আসেন তিনি।


অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী সরকারের পতনের পর সারাদেশের মতই সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থাগুলোতে ব্যাপক অস্থিরতা চলছিল। অস্থিরতা কমাতে পদক্ষেপ না নিয়ে তিনি কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক গ্রুপ তৈরি করেন। একটিকে আরেকটির পেছনে লাগিয়ে রাখতেন নিজের সুবিধার জন্য। যা আদতে কৃষি কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের কর্মবিমুখ পরিবেশ তৈরিতে সহযোগীতা করেছে। মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ বিভিন্ন দফতর/সংস্থায় ডিজিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের অনুসারীদের নিয়োগ বা পদায়নের অভিযোগ বেশ জোড়ালো। সেক্ষেত্রে, বিগত ফ্যাসিস্ট অনুসারীদেরই পছন্দ ছিল তার। এর মধ্যে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) ডিজি  ড. সামিয়া সুলতানা এবং বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের ডিজি নার্গীস আক্তার অন্যতম।


একইভাবে অনিয়ম ও অদক্ষতার ব্যাপক অভিযোগ থাকার পরও তিনি যোগদানের পর ডিএইর পার্টনার প্রকল্পের তৎকালীন প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মিজানুর রহমানকে দায়িত্বে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে এই কর্মকর্তা সারাদেশের প্রকল্প সংশিষ্টদের কাছ থেকে ডিএই তে নগদ টাকা তুলতে গিয়ে ধরা পড়ায় তাকে বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে সেখানে নিয়োগ দেয়া হয় নিজের এলাকা গাজীপুরের আবুল কালাম আজাদকে। এই কর্মকর্তাও অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই অদক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন।


জানা গেছে, সচিবের ভুল তথ্যের কারণে চলতি মৌসুমের আগে পেঁয়াজের দাম প্রায ১৩০ টাকায় উঠে। তবে অন্তর্বতীকালী সরকারের শেষ সময়ে এসে এই কর্মকর্তা অগামী ২০৫০ সাল পর্যন্ত বছরের কৃষি নিয়ে একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেন। কিন্তু পরিকল্পনাটি তিনি এতটাই তড়িঘরি করে তৈরি করেন যেখানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকেই আদতে পরিকল্পনা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ। এর পুরো দায়িত্ব দিয়েছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের পিপিসি উইং এর অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মাহমুদুর রহমানকে। তিনি শুধু এই দায়িত্বই নয়, মন্ত্রণালয়ে সচিবকে সব ধরনের পরামর্শ প্রদান করতেন বলেও জানা গেছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডিম-মুরগি বিক্রি : সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের পাশাপাশি ন্যূনতম

1

ব্রি’র অর্গানিক সার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাবে ইউরিয়ার ব্যবহার

2

বাড়ির দোতলায়ও পানি, ভাই–বোনের খোঁজ পাচ্ছেন না গায়িকা পুতুল

3

যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকে ঢুকলে দেখা যাচ্ছে নতুন বার্তা

4

সীড এসোসিয়েশনের নতুন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ

5

ক্যাডেটরা গভীর সমুদ্রের অকুতোভয় কাণ্ডারী হতে চলছে : মৎস্য ও

6

রিকশাচালককে গুলি করে হত্যা মামলায় কারাগারে চিকিৎসকসহ পাঁচজন

7

পেঁয়াজ পচা রোধে বড় উদ্যোগ, বসছে ৮ হাজার এয়ার-ফ্লো মেশিন : কৃ

8

মেহেরবানি করে চাঁদাবাজি করবেন না, রাজশাহীতে কর্মী সম্মেলনে জ

9

পেঁয়াজ আমদানি অনুমতি আরও বাড়লো

10

‘দেশীয় বালাইনাশক শিল্পে টিকে থাকতে কাঁচামালে ৫৮ শতাংশ শুল্ক

11

বাধ্যতামূলক অবসরে সচিব মিয়ান কৃষিতে রেখে গেছেন নিজস্ব বলয়

12

কোনো সভ্য দেশে কূটনৈতিক স্থাপনায় এ ধরনের হামলা হতে পারে না

13

স্থানীয় সরকার নয়, জাতীয় নির্বাচন আগে চায় বিএনপিসহ বিভিন্ন দল

14

প্রতিযোগী দেশের সাথে টিকে থাকা দায় দেশীয় স্পিনিং শিল্পের

15

অবৈধ ইটভাটায় যাচ্ছে কৃষি জমির উর্বর মাটি

16

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ১০০ কোটি টাকার ভর্তুকি

17

এটা স্কুল নয়, শাস্তিও নয়—বললেন ভারতের প্রধান নির্বাচক

18

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বন্ধই কী সমাধান!

19

টেকসই খাদ্য নিরাপত্তায় মূল চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন : কৃষিম

20