কৃষি সময়
প্রকাশ : Jan 17, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

বিদেশ নয়, এটা বাংলাদেশ,সমতলেই এখন সফল কমলা চাষ

বাংলাদেশে কমলা মানেই পাহাড়। পার্বত্য অঞ্চল ছাড়া কমলা চাষ হয় না- এমন ধারণা ছিল এক সময়। কিন্তু, গত এক দশকে চিরায়িত সেই ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে চুয়াডাঙ্গার কৃষি উদ্যোক্তারা। সমতলের মাটিতে সবুজ মাল্টার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশীয় জাতের কমলা চাষে ভাগ্যবদল হচ্ছে। বদলে দিচ্ছে চুয়াডাঙ্গার কৃষি অর্থনীতি, তৈরি করছে কোটি টাকার বাজার ও শত শত মানুষের কর্মসংস্থান। স্থানীয় কৃষি অফিস ও বিভিন্ন কৃষি প্রকল্পের সহায়তায় উদ্যোক্তারা পেয়েছেন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ। নিজেদের শ্রম ও মেধা আর ধৈর্য দিয়ে তারা প্রমাণ করেছেন শুধু পাহাড় নয়, সমতলের মাটিতেও কমলার সফল চাষ সম্ভব।


চুয়াডাঙ্গার যে কয়েকজন কৃষি উদ্যোক্তার কারণে সমতল তথা চুয়াডাঙ্গা ‘কমলার বাড়ি’তে রূপ নিয়েছে তাদের অন্যতম জেলার জীবননগর উপজেলার মানিকপুর গ্রামের সজল আহমেদ। তিনি যেন এখন গ্রামবাংলার হাজারো তরুণের স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। এসএসসি পাসের পর তার সামনে ছিল না বড় কোনো পুঁজি, ছিল না নিজের জমিও। ২০০৯ সালে অন্যের কাছ থেকে সাত বিঘা জমি লিজ নিয়ে বরই ও পেয়ারা চাষ শুরু করেন। প্রথম বছরেই সফলতা আসে। এতে সাহস জোগায় তাকে। তিনি বুঝতে পারেন- কৃষি মানে শুধু টিকে থাকা নয়, সঠিক পরিকল্পনা ও জ্ঞান থাকলে এখানেই গড়া যায় ভবিষ্যৎ। স্থানীয় কৃষি অফিসও এগিয়ে আসে। তাকে দেয়া হয় উদ্যোক্তাসহ নানা প্রশিক্ষণ। কৃষির বিভিন্ন প্রকল্পের পক্ষ থেকেও সহযোগিতার হাত বাড়ানো হয়।

সজল আহমেদ জানান, শুরুতে পরিবার থেকেও তিনি তেমন সমর্থন পাননি। অনেকেই মনে করতেন, ফল চাষ করে বড় কিছু করা সম্ভব নয়। তিরস্কার করতেন অনেকে। কিন্তু সময়ের সাথে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখন পরিবার ও এলাকাবাসী সবাই তার পাশে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক, শিক্ষিত তরুণ ও দর্শনার্থীরা তার বাগান দেখতে আসছেন। সজলের বিশ্বাস, তরুণরা যদি পরিকল্পিতভাবে ফলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে এগিয়ে আসে, তাহলে বেকার সমস্যার বড় অংশের সমাধান সম্ভব। কমবে ফল আমদানির নির্ভরতা, গড়ে উঠবে ফলকেন্দ্রিক এগ্রো ট্যুরিজম।

গত ৯ জানুযারি শীতের দুপুরে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মানিকপুর গ্রামে ঢুকতেই মনে হয় যেন সমতল ছেড়ে পাহাড়ি কোনো জনপদে এসে পড়েছি। চারপাশজুড়ে সবুজ বাগান, তার ভেতর সারি সারি গাছ, ডালে ডালে থোকায় থোকায় ঝুলছে পাকা হলুদ কমলা, মাল্টা।

সাত বিঘা জমি দিয়ে শুরু করা সজলের সেই ছোট উদ্যোগ আজ দাঁড়িয়েছে ১৩৯ বিঘায়। দেশী-বিদেশী ফলের বিশাল মিশ্র বাগানে উৎপাদিত হচ্ছে অন্তত ৫৫০ প্রজাতির ফল। এর মধ্যে শুধু মালটা ও কমলাই রয়েছে শত প্রজাতির। চলতি মৌসুমে প্রায় দুই কোটি টাকার ব্যবসা করেছেন তার বাগান থেকে। তার বাগানে নিয়মিত কাজ করেন ৪২ জন শ্রমিক, মৌসুমে আরো ১০-১২ জন যুক্ত হন। খরচ বাদ দিয়ে লাভ হয়েছে অন্তত এক কোটি টাকা। এক সময় যে তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত ছিলেন, আজ তার বাগানই এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের বড় ভরসা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল শেষ হচ্ছে। কিন্তু সজলের বাগানের চমক শেষ হয় না। মন চায় আরো ঘুরতে। তবে, কমলা ও মাল্টার পাশাপাশি বারোমাসি কাঠালেও চমক দেখাচ্ছেন তিনি। জেলার বাইরে থেকেও পর্যটকদের সজলের ফল বাগানে দেখা গেল পরিবারসহ। ভবিষ্যতে এগ্রো ট্যুরিজম নিয়েও ভাবছেন এ তরুণ উদ্যোক্তা।

জানা গেল জেলায় বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষ শুরু হয় ২০১৫ সালের দিকে। অল্প সময়েই কৃষকদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। কমলা ও মাল্টাচাষে সফলতা পেয়েছেন জীবননগর উপজেলার হাশাদাহ গ্রামের আশরাফুল ইসলাম। এমবিএ শেষ করে ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করতে তিনি। করোনোকালে বেকার হয়ে পড়েন। আগে থেকেই বাবার জমিতে সবজি ও কিছু ফল চাষ হতো। ২০২০ সালে সেখানেই যুক্ত হন তিনি। পেয়ারা বাগান দিয়ে শুরু করে তিনি মাল্টা, আঙ্গুর, স্ট্রবেরি ও সবজি চাষে হাত দেন। এখন তার ৩৯ বিঘা জমিতে পেয়ারা, মাল্টা, দার্জিলিং ও চাইনিজ কমলা, আঙ্গুর ও নানা সবজি চাষ হচ্ছে। এখান থেকে তার বার্ষিক বেচাকেনা কোটি টাকার উপরে। নিয়মিত ৮-১০ জন এবং মৌসুমে ৩০-৪০ জন শ্রমিক কাজ করে তার বাগানে। খরচ বাদে অর্ধকোটি টাকা আয় তার ।

উপজেলার রায়পুর গ্রামের ডিপ্লোমা কৃষিবিদ সাদ্দাম হোসেন তো রীতিমতো নার্সারি ব্যবসায় বিপ্লব ঘটিয়েছেন। শত বিঘার বেশি জমিতে ফলের বাগান। প্রায় ১০ বিঘা জমিতে ‘মোল্লা নার্সারি’। ছোট ভাই হৃদয়কে নিয়ে তার এ বিশাল কৃষি সাম্রাজ্য। তার বাগান ও নার্সারিতে বেশিরভাগই উচ্চমূল্যের ফল ও চারা উৎপাদন হয়। বিদেশী জানা-অজানা নানা জাতের কমলা, মাল্টা, পার্সিমন, লঙ্গান পার্সমন, আঙ্গুর, বারোমাসি কাঠাল, আপেল, আনারসহ শতাধিক ফল চাষ হয়। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের এসব ফলের চারা উৎপাদন করে বাজারজাত করছেন। বছরে প্রায় এক কোটি টাকা চারা বিক্রি করেই আসে। বাগান ও নার্সারি মিলিয়ে তার বাৎসরিক বাণিজ্য প্রায় দেড় কোটি টাকা।

সাদ্দাম হোসেন জানান, খরচ বাদে বছরে আয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা। ৪০-৫০ জন শ্রমিক কাজ করেন তার বাগান ও নার্সারিতে।

জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: আলমগীর হোসেন জানান, জেলায় প্রথম কমলার চাষ শুরু হয় এ উপজেলাতেই। কৃষি বিভাগ নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।

যশোর অঞ্চলে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পিডি রবিউল ইসলাম জানান, সফল কমলাচাষী সজল আহমেদ, সাদ্দাম হোসেনসহ এ অঞ্চলের কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে প্রকল্প থেকে। সফল এসব উদ্যোক্তাদের দেখে অন্যরাও কৃষি উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত হচ্ছেন। তিনি জানান, চুয়াডাঙ্গার কমলার স্বাদ ও রং আমদানিকৃত কমলার চেয়ে ভালো। কম খরচে বেশি লাভের সম্ভাবনা থাকায় এ ফল চাষে আগ্রহ বাড়ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের চুয়াডাঙ্গা জেলার তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছর পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গায় ৭৮ হেক্টর জমিতে কমলার চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে অন্তত ৩৯০ টন। বিঘাপ্রতি ফলন ১৫০-১৭০ মণ। কেজিপ্রতি ১৪০-১৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়ে বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩ কোটি টাকা। কমলা চাষ ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। 

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও ছাড়

1

বরিশালে এক নবজাতককে ৩ দিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না, মায়ের বিরুদ্ধ

2

ভারতের সঙ্গে কথা হবে চোখে চোখ রেখে

3

মিথেন গ্যাস নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চায় বাংল

4

খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দিনের আন

5

এআইইউবিতে চাকরি মেলা অনুষ্ঠিত

6

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি

7

সম্ভাবনার নতুন ঠিকানা চলনবিল

8

বিভেদের জেরে ব্রি’র মহাপরিচালকের দায়িত্বে অতিরিক্ত সচিব

9

বদলে যাচ্ছে কুষ্টিয়ার মসলার গ্রাম

10

সাশ্রয়ীমূল্যে সার সরবরাহে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ : সংসদে

11

অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমাতে জানুয়ারিতে সচেতনামূলক কর্মসূ

12

শ্রীলঙ্কার পেরাদেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্ক এগ্রিকালচার সেন্ট

13

শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরি: তাহিরপুরে বোরো আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্

14

নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান

15

অন্ধকারে ৭২১ কোটির ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ কার্যক্রম

16

কৃষির উন্নয়ন হলে দেশের উন্নয়ন হবে : মন্ত্রী

17

শরীয়তপুর সাংবাদিক সমিতির সভাপতি পলাশ, সম্পাদক মামুন

18

প্লানিং কমিশনের সদস্যের বক্তব্য অবাক হয়ে শুনলেন সবাই ।। ড. ক

19

বর্তমান সরকারের প্রধান দায়িত্ব শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে বিচার

20