নিজস্ব প্রতিবেদক
বাজারে সবজির দাম বাড়ছে, কিন্তু মাঠে সেই দাম পৌঁছাচ্ছে না উৎপাদকের হাতে। রাজশাহী থেকে কুমিল্লা, সিরাজগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ—বিভিন্ন জেলায় কৃষকেরা লোকসানে সবজি বিক্রি করছেন। উৎপাদন খরচের নিচে পাইকারি দাম, আড়ত–দালালের নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ব্যয় ও অকার্যকর বাজার ব্যবস্থায় ভোক্তা বেশি দাম দিচ্ছে, আর কৃষক পাচ্ছেন সবচেয়ে কম। দেশে সবজি উৎপাদন রেকর্ড হলেও বিপণন কাঠামোর দুর্বলতায় কৃষকের ঘরে ফিরছে হতাশা, ঋণ আর বঞ্চনা।
শীতকালেও ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে শাকসবজির দাম চড়া । ভোক্তারা অভিযোগ করেন–কারওয়ান বাজারসহ ঢাকার দোকানগুলোতে প্রতি কেজি টমেটো ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ফুলকপি ৬০-৭০ টাকা, বেগুন ৭০-৯০ টাকা, শিম ৭০-৮০ টাকা, মুলা ৪০-৫০ টাকা—এমন দামে কিনতে হচ্ছে। অথচ মজার ব্যাপার হলো, এই সবজির প্রকৃত উৎপাদক কৃষক তার উৎপাদিত কাঁচামালের অর্ধেক মূল্যও পান না। মাঠ থেকে আড়তে যাওয়ার পথে, আড়ত থেকে পাইকার, পাইকার থেকে খুচরা বিক্রেতা–দীর্ঘ শৃঙ্খলে বড় অংশটাই চলে যাচ্ছে দালাল ও পরিবহন খরচে। ফলে ভোক্তা যখন বাড়তি মূল্য দিচ্ছে, কৃষকের হাতে তখন ক্ষতি আর হতাশা ছাড়া কিছু থাকছে না।
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে এই মৌসুমে টমেটোর আবাদ হয়েছে দারুণ। কৃষকেরা জানিয়েছেন, কেজি টমেটো চাষে তাদের খরচ পড়ছে প্রায় ২৫-৩০ টাকা। কিন্তু পাইকারি বাজারে তারা পাচ্ছেন কেজিতে ২০-২২ টাকা। অনেকে বাধ্য হয়ে ফসল ক্ষেতেই নষ্ট করে ফেলেছেন। দুই দিন আগেও স্থানীয় এক আড়তে কৃষক জসিম উদ্দিন মাত্র ১২০ কেজি টমেটো দিয়ে পান ২,৫০০ টাকা—খরচ বাদ দিলে হাতে টেকেই মাত্র ২০০-৩০০ টাকা। অথচ একই টমেটো রাজধানীতে উঠছে কেজিতে ৯০-১০০ টাকায়। জসিম বলছিলেন, “করি পরিশ্রম, কিন্তু দাম নিয়ন্ত্রণ করেন দালালরা। আমরা বাঁচি কেমনে?”
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বেগুনের উৎপাদন ভালো, কিন্তু বাজারের অবস্থা উল্টো। কৃষকেরা পাইকারি পর্যায়ে কেজিতে পাচ্ছেন ১৮-২২ টাকার বেশি নয়। অথচ ঢাকায় এ বেগুন ৭০ টাকার নীচে পাওয়া যাচ্ছে না। জেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের কৃষক আবদুস সালাম জানান, বেগুন চাষে তার বিঘাপ্রতি খরচ পড়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। ফলন দেড় থেকে দুই টন। কিন্তু আড়তের দামে বিক্রি করলে লাভের বদলে ঋণ শোধ করতে হয়। তিনি বলেন, “বেগুন বিক্রি করে তো খরচই উঠে না, বরং সার, কীটনাশক আর শ্রমিক মজুরি যোগ করতে এখন মহাজনের কাছে ধার নিতে হয়।”
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় শিম ও মুলা উৎপাদন এ বছর প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, কিন্তু দাম কম। কৃষকেরা অভিযোগ করছেন, শিম কেজিতে চাষে খরচ ৩০-৩৫ টাকা, কিন্তু পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ২৮ টাকায়। একই শিম চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় আড়তদারদের হাতে বাজার চক্র ঘুরছে বলে মন্তব্য স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের। মুলা তো আরও করুণ–পাইকাররা গা এলিয়ে দিয়েছে ১২-১৫ টাকার বেশি দিচ্ছে না। অথচ সড়ক ও রেল পরিবহন খরচ, আড়তে শ্রমিক ও ট্রাক ভাড়া যোগ হয়ে শহরে পৌঁছালে সেই পণ্যের দাম দ্বিগুণ।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ফুলকপির ফলন রেকর্ড—কিন্তু দাম মাটিতে। কৃষকেরা ফুলকপি চাষে প্রতিপিস খরচ রেখেছেন ১৫-১৮ টাকা। মাঠ থেকে সেটা বিক্রি করছেন ১০-১২ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিপিসে ৪-৫ টাকা লোকসান। একজন কৃষক বারোমাসি চাষের জন্য জমি ইজারা নিয়েছেন, কিন্তু এখন জমা দিতে পারছেন না। তার ভাষায়, “কপি জমি থেকে তোলার আগে লোকসান নিশ্চিত। কিন্তু তুলতেই হয়, নইলে নষ্ট।” অন্যদিকে, রাজধানীর কাঁচাবাজারে এই ফুলকপি প্রতিপিস ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এখানেই দেখা যায় দামের নির্মম ব্যবধান।
ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় শসার দাম এমন পর্যায়ে নেমেছে যে অনেক কৃষক শসা পশুখাদ্য হিসেবে দিয়ে দিচ্ছেন। কেজিতে চাষে ১৫-১৮ টাকা খরচ, বিক্রি কেজিতে ৮-১২ টাকা। পরিবহনে খরচ পড়ে ৬-৭ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদক একেবারেই লাভবান নন। বরং আর্থিক ক্ষতি নিয়ে মৌসুম শেষ করতে হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, দূরপাল্লার পরিবহনে ট্রাকভাড়া, ঘুরপথে কর, আড়ত ফি—সব মিলে দামে লাফ। কিন্তু এই লাফের ফায়দা পাচ্ছেন না কৃষক, বরং ভোক্তা ও কৃষক দুই পক্ষই অসন্তুষ্ট। লাভবান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরাই।
কৃষি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবজির মূল্য শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ না থাকা, কৃষকের বাজার-সংযোগ দুর্বল, আড়তদার নির্ভরতা এবং পরিবহন ব্যয়ের অনিয়ম মূলত উৎপাদককে বঞ্চিত করছে। তারা বলছেন, দেশে সবজি উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কোনো স্থায়ী বাজার অবকাঠামো নেই। ফলে মৌসুম ভালো হলো মানেই দাম কমে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর মৌসুম খারাপ হলে ভোক্তা বাড়তি দাম দেয়।
জাতীয় সবজি উৎপাদনের ভৌগোলিক চিত্রও এই সংকট ব্যাখ্যা করে। উত্তরবঙ্গ–রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া—এ এলাকায় টমেটো, বেগুন, শসা ও শিমের উৎপাদন এখন শীর্ষ পর্যায়ে। মধ্যাঞ্চলের কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ফেনীতে মুলা, লাউ, বোরবটি ও কুমড়ার সরবরাহ বেশি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খুলনা, যশোরে ফুলকপি ও বাঁধাকপির উৎপাদন রেকর্ড। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী বিপণন চক্র ও সংরক্ষণ সুবিধা নেই বলে বাজারে দ্রুত সরবরাহ করতে গিয়ে কৃষক দামে পড়ে যান। আবার শহরে পরিবহন ও ব্যক্তিগত স্তরে মুনাফাবাজির কারণে দাম দ্বিগুণ হয়ে ওঠে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের নীতি আধুনিক হলেও মাঠে অপারেশন নেই। জেলা পর্যায়ে কৃষকের সরাসরি বিপণন কেন্দ্র, হিমাগার ও স্বল্পসুদে পরিবহন সহযোগিতা বাস্তবায়ন না হলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন না। বেশ কয়েক বছর ধরে সরকার কৃষিমূল্যে “প্রকৃত কৃষক শনাক্ত” নীতি নিয়েছে। এ বিষয়ে ডাটাবেজ তৈরির প্রকল্প শুরু হয়েছে। কিন্তু স্মার্ট কৃষক কার্ড, সরাসরি প্রণোদনা ও ভর্তুকি ব্যবস্থায় অগ্রগতি থমকে আছে। ভর্তুকির সুবিধা প্রকৃত উৎপাদকের বদলে দলিলধারী ভূমি-মালিক বা দালালরাই গ্রহণ করছেন—এমন অভিযোগ মাঠে প্রায়ই শোনা যায়।
পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে বার্ষিক ১ কোটি ৯০ লাখ টন সবজি উৎপাদিত হয়—যা দক্ষিণ এশিয়ায় মাথাপিছু সবজি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে শীর্ষ দিকে রেখেছে। কিন্তু কৃষকেরা এই বাজারের আর্থিক অংশীদার হতে পারছেন না। বাণিজ্যিক বাজার গড়ে ওঠছে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে; কৃষক সেখানে কেবল উৎপাদন শ্রমিকের ভূমিকা পালন করছেন। দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খলে উৎপাদক অংশগ্রহণ হয় মাত্র ২০-২২ শতাংশ; বাকি মূল্য চলে যাচ্ছে পরিবহন, আড়ত ও খুচরা বাণিজ্যের কাছে।
জেলাভিত্তিক নজর দিলে আরেক দিকও পরিষ্কার হয়—কৃষকের ক্ষতির কারণ শুধু ভর্তুকি বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং বাজার কাঠামো পরিবর্তনে সরকারি সংযোগের অভাব। ঢাকামুখী সবজি ট্রাকগুলোতে প্রভাবশালী মহলের কর-উঠতি ও প্রতিরোধমূলক টোল যুক্ত থাকে। এতে প্রতি কেজিতে দুই থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত হিসাব যোগ হয়। একই সঙ্গে আড়ত মালিকরা কৃষকের পণ্যের ওপর “ওঝাঁড় ফি, ঢালাই ফি, লেবার চার্জ ও কমিশন” আরোপ করেন, যা কেজিতে ৭-১২ টাকার মত দাম তুলে দেয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশজুড়ে কৃষকেরা ক্রমেই নগদ ফসল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। উত্তরাঞ্চলে বহু কৃষক এ মৌসুমে টমেটো বাদ দিয়ে গম কিংবা ভুট্টার দিকে ঝুঁকছেন। কুমিল্লায় শসাচাষি অনেকে পরের মৌসুমে সরিষা চাষ করার পরিকল্পনা করছেন—কারণ সরিষা বিক্রি হয় সরকারি বস্তায়, খামারে খামারে সংগ্রহ হয়, আর দাম নির্ধারণ অনেকটাই স্থায়ী। অনেকে বলছেন, কৃষকের বাঁচার জন্য নীতি বদলানো জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজারে নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য কমিশন প্রয়োজন—যা প্রতিবছর মৌসুমভিত্তিক কৃষিমূল্য নির্ধারণ করবে এবং আড়তদারের কমিশন সীমিত করবে। জেলা শহরগুলোতে সরকারি কৃষি মার্কেটিং সেন্টার চালু করলে কৃষক সরাসরি বিক্রির সুযোগ পাবে। আর সরবরাহচক্রে দালাল কমাতে ডিজিটাল অর্ডার এবং সমবায় পরিবহন চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ যখন স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে, তখন এই বাজারের সুফল কি কৃষক আদৌ পাচ্ছেন? ভোক্তা ও উৎপাদক–উভয় শ্রেণি যখন মূল্যবৈষম্যের শিকার, তখন এই শৃঙ্খল টিকিয়ে রাখছে কারা? সেই উত্তরের দিকেই এখন নজর দেশের কৃষি।