অ্যাটলাস ‘অ্যাকাসা’র উদ্বোধন
নিজস্ব প্রতিবেদক
দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁঁকি থেকে রক্ষা এবং অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে নতুন পথ দেখাল বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো এ অঞ্চলে জলবায়ুসম্মত কৃষির জন্য উন্মোচিত হলো ‘অ্যাটলাস অব ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন ইন সাউথ এশিয়ান এগ্রিকালচার’ (অ্যাকাসা- ধপধংধ-নরংধ) নামের একটি ওয়েব পোর্টাল। অ্যাকাশা হলো ওয়েব-ভিত্তিক, উন্মুক্ত-প্রবেশাধিকারযুক্ত একটি প্ল্যাটফর্ম; যেখানে ১৫টি প্রধান ফসল এবং ছয়টি পশুপালন উপখাতের জলবায়ু ঝুঁকি, দুর্বলতা, ফসলভিত্তিক প্রভাব ও বৈজ্ঞানিক অভিযোজন ব্যবস্থা সংহতভাবে একত্রিত করা হয়েছে। ‘অ্যাকাসা’ সমন্বিত ডাটা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং বৈজ্ঞানিক অভিযোজন কৌশলের মাধ্যমে কৃষি পরিকল্পনায় যুগান্তকারী সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই তথ্যভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফরমটি বাংলাদেশকে শুধু জলবায়ু-স্মার্ট কৃষিতে এগিয়ে নেবে না, বরং কৃষি নীতিনির্ধারণে নতুন যুগের সূচনা করবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ফার্মগেটস্থ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে তিন দিনব্যাপী (৯-১১ ডিসেম্বর) জাতীয় কর্মশালায় ‘অ্যাকাসা পোর্টাল’-এর উদ্বোধন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুস সালাম। উদ্বোধনী সেশনে সভাপতিত্ব করেন বিএআরসি’র সদস্য পরিচালক(এইআরএস) ড. মো. মোশাররফ উদ্দিন মোল্লা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন) মির্জা শওকত আলী, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ড. মো. বাইজার রহমান এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (সম্প্রসারণ ও সমন্বয়) ড. মো. আবদুল আজিজ।
ভারতের বিসা-সিমিট (বরলাউগ ইন্সটিটিউট ফর সাউথ এশিয়া)-এর অ্যাপ্লাইড ডাটা সায়েন্স বিশেষজ্ঞ ড. প্রসুন কুমার গাঙ্গোপাধ্যায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন বিএআরসি’র পরিচালক (কম্পিউটার ও জিআইএস ইউনিট) হাসান মো. হামিদুর রহমান এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিএআরসির বন ইউনিটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম মাহবুব। কর্মশালায় নার্স প্রতিষ্ঠান, ডিএই, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সংশ্লিষ্টরা জানা, অ্যাকাসা প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে দেশভিত্তিক সংস্করণ চালুর নেতৃত্বশীল ভূমিকা নিয়েছে। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। জলবায়ু ঝুঁকিতে উচ্চমাত্রায় উন্মুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় দেশ, যেখানে পরিকল্পনা ও পরামর্শ উপকরণ হিসেবে আকাশা কার্যকরভাবে চালু হলো। এতে জলবায়ুস্মার্ট কৃষি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবনে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি আরও স্পষ্ট হলো। প্ল্যাটফর্মটি সিমিট, বিসা, আইসিএআর, নার্ক, এনআরএমসি এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় যৌথভাবে উন্নয়ন করা হয়েছে। এটি উচ্চমাত্রার ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও অভিযোজনগত অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করছে, যা এখন দ্রুত বাংলাদেশের সরকারি কৃষি সংস্থাগুলোর মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশের দলনেতা এবং বিএআরসির পরিচালক (কম্পিউটার ও জিআইএস ইউনিট) হাসান মো. হামিদুর রহমান বলেন, ‘অ্যাকাশা জলবায়ুবিপদ, ঝুঁকির পরিমাণ এবং উপদ্রব সূচক, ফসলভিত্তিক প্রভাব ও সমৃদ্ধ অভিযোজন কৌশলকে একত্র করেছে। এটি কেবল একটি জলবায়ু প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং একটি জাতীয় জ্ঞানভাণ্ডার।’
আকাশার প্রেক্ষিত তুলে ধরে, বিসা-সিমিট ভারতের অ্যাপ্লাইড ডেটা সায়েন্স বিশেষজ্ঞ ড. প্রসুন কুমার গাঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘বিসা তার আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে অ্যাকাশা নির্মাণে গর্বিত। এটি বাস্তবসম্মত অভিযোজন কৌশল তুলে ধরে যা দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু-স্মার্ট বিনিয়োগ ও নীতিমালাকে সহায়তা করে এবং কৃষি উৎপাদনের সিদ্ধান্তকে আরও স্থিতিশীল করে।’
বিএআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুস সালাম বিজ্ঞানভিত্তিক জলবায়ু অভিযোজন ও স্থিতিশীল কৃষি পরিকল্পনায় প্ল্যাটফর্মটির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘অ্যাকাশার বিশেষত্ব হলো সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, বৈজ্ঞানিক মান ও ব্যবহারযোগ্যতা। পোর্টালটি জেলা পর্যায় পর্যন্ত জলবায়ুঝুঁকি মানচিত্র, এক্সপোজার প্রোফাইল, ঝুঁকি সূচক ও দুর্বলতার মান দেখায় এবং ফসল ও পশুপালনে সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরে। এই বিস্তারিত তথ্য গবেষণা, সম্প্রসারণ, পরিকল্পনা ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত-সহায়ক উপাত্তে রূপান্তর করে। অ্যাকাশা অভিযোজন পদ্ধতির বাস্তবায়নযোগ্যতা ও প্রসারণ-সম্ভাবনা মূল্যায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশি পরিকল্পনার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করে, যা আমাদের পদক্ষেপকে ন্যায়সঙ্গত ও প্রেক্ষিতভিত্তিক করে।’
বিএআরসি’র সদস্য পরিচালক (এইআরএস বিভাগ) এবং সভার সভাপতি ড. মো. মোশরাফ উদ্দিন মোল্লা বাংলাদেশের উপকূলীয় লবণাক্ততা, বারিন্দ খরা, হাওর আকস্মিক বন্যা এবং ব্যাপক জলাবদ্ধতার মতো বৈচিত্র্যময় জলবায়ু চাপের কথা তুলে ধরে জানান, অঞ্চলভিত্তিক অভিযোজন গবেষণা জরুরি, আর অ্যাকাশা এ ধরনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সক্ষম করছে।
এদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির পরিচালক মির্জা শওকত আলী বলেন, ‘বাংলাদেশ জলবায়ু-স্মার্ট কৃষির পথে অগ্রসর হচ্ছে। এজন্য স্থানভিত্তিক জলবায়ুকর্মের সামগ্রিক মূল্যায়ন প্রয়োজন, অ্যাকাশা সেই শূন্যতা পূরণে সহায়ক হবে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে পোর্টাল পরিচালনা সীমাবদ্ধ, তাই কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে অ্যাকাশা দলকে নিয়মিত তত্ত্বাবধান করতে হবে।
পশুপালন-সংক্রান্ত জলবায়ু ঝুঁকি ও স্বাস্থ্য বিষয়ে ড. মো. বাইজার রহমান (পরিচালক-ডিএলএস) জানান, উদীয়মান রোগের প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রাণিজ উৎস থেকে আসে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এসব ঝুঁকি জনস্বাস্থ্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং পশুপালন ব্যবস্থায় দ্রুত রূপান্তরের ওপর জোর দেন। কৃষি-পশুপালন যৌথ সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। বিষয়টি সমর্থন করে ডিএই’র অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ‘আকাশা পোর্টাল উপজেলা পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণকে আরও কার্যকর করবে। জলবায়ুঝুঁকির মানচিত্র ব্যবহার করে উপজেলা কৃষি অফিসাররা ফসল-পঞ্জিকা উন্নত করতে পারবেন এবং ব্লক সুপারভাইজাররা জলবায়ুসংবেদনশীল এলাকাভিত্তিক প্রদর্শনী প্লট নির্বাচন করতে পারবেন।’
বিভিন্ন সংস্থার অংশগ্রহণকারীরা অ্যাকাশার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, প্ল্যাটফর্মটি জলবায়ু-হটস্পট শনাক্ত করতে সম্প্রসারণ সেবা ও পশুপালন প্রতিক্রিয়া নির্দেশনা দিতে এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা সহায়তা করতে সক্ষম। ২৫ বর্গকিলোমিটার রেজোলিউশনের মানচিত্র ব্যবহারকারীদের গ্রাম-গুচ্ছ পর্যায়ে ঝুঁকি বিশ্লেষণ, তথ্য ডাউনলোড এবং অভিযোজন কৌশল মূল্যায়নে সহায়তা করে। ইতোমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই), ব্র্যাক, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেড এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার শুরু করেছে।
মন্তব্য করুন