কৃষি সময়
প্রকাশ : Dec 30, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

অন্ধকারে ৭২১ কোটির ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ কার্যক্রম

নিজস্ব প্রতিবেদক
কৃষিকে ডিজিটাল তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর এবং প্রকৃত কৃষকের হাতে সরাসরি সরকারি ভর্তুকি পৌঁছে দেয়ার লক্ষে ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘পার্টনার’ (প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স)। প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন সে সময়ের কৃষিসচিব ওয়াহিদা আক্তার। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭২১ কোটি টাকা রাখা হয় ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’-এর জন্য। কৃষককে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে তথ্য যুক্ত করে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা, ভুয়া তালিকা, দ্বৈত সুবিধা কিংবা মুখস্থ ভর্তুকি বণ্টন বন্ধ করা, সরকারি ভর্তুকির অর্থ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা কার্ডভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ কর্মসূচি হাতে নেয় বিগত সরকার। কিন্তু, প্রকল্প শুরুর প্রায় আড়াই বছর অতিবাহিত হলেও প্রকৃত কৃষকদের তালিকা করে তাদের হাতে ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ তুলে দেয়া তো দূরের কথা, কার্যক্রমই শুরু করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। 

সরকারের ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ কার্যক্রম থমকে থাকলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনী প্রচারণায় সামনে এসেছে ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ইস্যু। তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। নির্বাচনী প্রচারণায় রাজনৈতিক দলগুলো কৃষককে আকৃষ্ট করতে নানা প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির মাঠ পর্যায়ের প্রচারণায় ‘কৃষক কার্ড’ বা ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর বিষয়টি জোরেসোরে উচ্চারিত হচ্ছে। 

জানা যায়, বিগত আওয়ামী আমলের ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল একনেক সভায় অনুমোদন পায় পার্টনার প্রকল্পটি। পরিকল্পনায় ছিল ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির মোট ৬ হাজার ৯১০ কোটি টাকার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন ১ হাজার ১৫১ কোটি টাকা, বিশ্বব্যাংক ৫ হাজার ৩০০ কোটি ও ইফাদ দিচ্ছে ৫০০ কোটি টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সাতটি সংস্থা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। দেশের ৬৪ জেলার ৪৯৫ উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটির অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি ছিল প্রায় দুই কোটি ২৭ লাখ কৃষক পরিবারকে স্মার্টকার্ড দেয়া হবে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল, প্রকৃত কৃষককে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে তথ্য যুক্ত করে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা। এতে ভুয়া তালিকা, দ্বৈত সুবিধা কিংবা মুখস্থ ভর্তুকি বণ্টন বন্ধ করা সহজ হবে। সরকারি ভর্তুকির অর্থ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা কার্ডভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের হাতে যাবে। আর এজন্য ডিপিপিতে স্মার্টকার্ড বিতরণের জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছিল প্রায় ৭২১ কোটি টাকা। ডিপিপি অনুযায়ী, প্রতিটি কৃষকের জন্য একটি ইউনিক আইডি তৈরি করা হবে। কার্ডে থাকবে এনআইডি নম্বর, ঠিকানা, জমির আয়তন, মৌসুমভিত্তিক আবাদ তথ্য, ফসলের ধরন এবং ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট নম্বর। এসব তথ্য ব্যবহার করে সার ও বীজের ভর্তুকি, কৃষিযন্ত্র প্রণোদনা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পুনর্বাসন এবং দুর্যোগ সহায়তা দ্রুত নির্ধারণ ও বিতরণ করার পরিকল্পনা ছিল। তথ্যভিত্তিক এই ব্যবস্থা চালু হলে কৃষি খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে, নীতি নির্ধারণে তথ্যপ্রমাণ ব্যবহার করা যাবে এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের সুযোগ কমবে, এমন প্রত্যাশা ছিল নীতিনির্ধারকদের। 

ডিপিপির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। উপজেলা পর্যায়ে স্থাপন করা হবে ডেটা এন্ট্রি, মনিটরিং ও ডাটাভেরিফিকেশন ইউনিট। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কৃষকের জমির তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করবেন। জমির ব্যবহার পরিবর্তন, ফসলের ধরন বদল, বন্যা বা খরার ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও যুক্ত হবে সেই ডাটাবেজে। ফলে কোথায় কোন ফসল বেশি, কোথায় উৎপাদন ঝুঁকি, কোন অঞ্চল ভর্তুকি বা সরকারি সহায়তার বেশি প্রয়োজন—তা রিয়েল-টাইম তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যাবে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ঝুঁকিপূর্ণ কৃষি অঞ্চলে জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণকেও এই ডাটাবেজের আওতায় আনা হয়েছে। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক চিহ্নিতকরণ, দ্রুত পুনর্বাসন এবং বীমা-ধরনের সহায়তার সম্ভাবনাও ডিপিপিতে সংযোজিত রয়েছে। কৃষকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে স্মার্টকার্ড ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সমন্বয় করা হবে বলে পরিকল্পনায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি ছিল, এটি শুধু কার্ড বিতরণের কর্মসূচি নয়, কৃষি ভর্তুকি বণ্টন পদ্ধতির কাঠামোগত সংস্কারের সূচনা। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভর্তুকি গেলে বদলে যাবে এক দশকের পুরোনো প্রথাগত সিস্টেম। কিন্তু  আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও স্মার্টকার্ড কার্যক্রম শুরুই করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। এই স্থবিরতা কৃষি খাতের সংশ্লিষ্টদের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। প্রকল্পের সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, বর্তমানে স্মার্টকার্ড বিতরণের পরিকল্পনা স্থগিত হয়েছে এবং প্রথম ধাপ হিসেবে কেবল কৃষকের তথ্য সংগ্রহ ও ডাটাবেজ তৈরিই অগ্রাধিকার পাচ্ছে। 

প্রকল্পটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানিয়ে পার্টনার প্রকল্পের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, এটা (কৃষক স্মার্টকার্ড) ফিজিক্যাল কার্ড হবে না, এটা হবে ভার্চুয়াল কার্ড। অর্থাৎ কার্ড হবে তবে, এটা মোবাইল অ্যাপ হবে। সারা পৃথিবীতেই ভার্চুয়ালি কার্ড হচ্ছে। আমরা সেদিকেই যাচ্ছি। সেক্ষেত্রে কার্ডের অন্যান্য সব তথ্য উপাত্ত ঠিক থাকবে। 

এতে (কৃষক স্মার্টকার্ড) প্রায় ৭২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মূল খরচ হবে তথ্য বা ডাটা সংগ্রহে। তবে, ভার্চুয়ালি কার্ড হলে খরচ কিছুটা কমবে। কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডাটা সংগ্রহ করা হবে। এটার (কার্ড করতে) দেরি হওয়ার মূল কারণ হলো ডাটা এন্ট্রি কাজটা করার কথা ছিল বিবিএস-এর। তথ্য সংগ্রহে তারা ২ হাজার কোটি টাকা চেয়েছিল। এতো টাকা তো আর দেয়া সম্ভব না। এজন্য আমরা আমাদের এসএও (উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা) এবং যে প্রতিষ্ঠান কাজটি পাবে (টেন্ডারে) তাদের সাথে যুক্ত করা হবে। 

প্রায় ২ কোটি ২৭ লাখ কৃষক এই কার্ড পাওয়ার কথা ছিল। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ওটা বিবিএস-এর খানা জরিপের তথ্য। যখন আমরা কার্ড করতে তথ্য সংগ্রহ করবো, প্রকৃত কৃষকের সংখ্যা কিছুটা কমতে পারে। 

কতদিন নাগাদ ভার্চুয়ালি কার্ড পেতে পারেন কৃষক? জানতে চাইলে পিডি বলেন, মাত্র আমরা প্লাটফরম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। এটা হওয়ার পর বড় ডাটা সংগ্রহের ফার্ম নিয়োগের টেন্ডার দেয়া হবে। এই অর্থবছরে এটা হয়তো করা সম্ভব হবে না। আগামী অর্থবছরে করতে হবে। এই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়তে হবে, নইলে টাকা খরচ করা যাবে না হয়তো। নিশ্চিত না যে কতদিন নাগাদ এটা (কৃষক স্মার্টকার্ড) করা যায়, কারণ এটার সাথে অনেক কিছু জড়িত তো..। রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হলে এক রকম হবে...., তো আমরা শুরু করছি। কাজটা পলিসি লেভেলে ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ গাইডলাইন অনুমোদন হয়ে গেছে। আগামী অর্থবছরে ডাটা সংগ্রহের জন্য ফার্ম নিয়োগের প্রক্রিয়া চলবে। 

প্রকল্প মেয়াদ তো ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত, এই সময়ের মধ্যে তাহলে ‘কৃষক স্মার্টকার্ড’ ভার্চুয়ালিও হচ্ছে না? বিষয়টি ‘না’ সূচক উল্লেখ করে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ২৮ সালের মধ্যে হয়তো ডাটা সংগ্রহের কাজটা হয়ে যাবে। অন্যান্য অনেক কাজ আছে, সেগুলো ২৮ সালের মধ্যে করা সম্ভব না। 

আগামী বছরের এপ্রিল-মে মাসের দিকে রিভিশনের কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন পিডি। তিনি জানান, আমরা প্রকল্প মেয়াদ ২ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করছি। তবে, প্রকল্পের খরচ হয়তো বাড়বে না। রিভিশন হবে কি হবে না তা বিশ্ব ব্যাংক, ইফাদ-তাদের উপর নির্ভর করছে। 

পার্টনার প্রকল্পটির প্রথম পিডি (পিসি) ছিলেন মিজানুর রহমান। অনিয়মের অভিযোগে মাঝপথে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। পিডি ও একাউন্ট্যান্টকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত টিম। মিজানুর রহমানকে সরানোর পর পিডির দায়িত্ব দেয়া হয় আবুল কালাম আজাদকে। শুরু থেকেই কৃষির গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটির কার্যক্রম থমকে দাড়ায়। বর্তমান পিডি আবুল কালাম আজাদ জানান, অর্থবছর শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত অগ্রগতি বলা যাবে না। তবে, এখন পর্যন্ত অগ্রগতি ২২ শতাংশ হয়েছে। 

(সূত্র: দৈনিক নয়া দিগন্ত)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘গোপন রাজনীতি’ নিষিদ্ধের দাবি জানাল ছাত্রদ

1

বাকৃবি শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সভাপতি রফিকুল সম্পাদক আসাদুজ্

2

বাধ্যতামূলক অবসরে সচিব মিয়ান কৃষিতে রেখে গেছেন নিজস্ব বলয়

3

তিন দাবি দ্রুত বাস্তবায়নে বাকৃবিতে মানববন্ধন

4

জিংকসমৃদ্ধ বিনাধান–২০ চাষে নতুন দিগন্ত উন্মোচন

5

অতীতের রাষ্ট্রপরিচালকেরা দুর্নীতি করে আঙুল ফুলে বটগাছ হয়েছেন

6

সফল কৃষি উদ্যোক্তা ফেনীর রিপন চেয়ারম্যান

7

ওয়ান হেলথ শুধু মুখের কথা নয়, দৃঢ় কমিটমেন্ট প্রয়োজন : ফরিদা আ

8

পেঁয়াজ পচা রোধে বড় উদ্যোগ, বসছে ৮ হাজার এয়ার-ফ্লো মেশিন : কৃ

9

চলনবিলের তাজা মাছ, সূর্য ওঠার সাথে সাথেই জমে ওঠে আড়ৎ

10

মেহেরবানি করে চাঁদাবাজি করবেন না, রাজশাহীতে কর্মী সম্মেলনে জ

11

কৃষির উন্নয়ন হলে দেশের উন্নয়ন হবে : মন্ত্রী

12

দেশের ২৪ জেলায় বইছে শৈত্যপ্রবাহ,সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি

13

টেকসই খাদ্য নিরাপত্তায় মূল চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন : কৃষিম

14

উপদেষ্টার ক্ষমতা প্রয়োগ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর!

15

অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমাতে জানুয়ারিতে সচেতনামূলক কর্মসূ

16

বৈজ্ঞানিকভাবে মাছ চাষ খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি

17

জীবন যুদ্ধে হার না মানা কৃষক সিরাজ শেখের সফলতার গল্প

18

কেআইবি ভবিষ্যতে সকল কৃষিবিদের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে

19

সেন্টমার্টিন মাস্টার প্ল্যানে ট্যুরিজমের আগে সংরক্ষণকে গুরুত

20