
ডিএই’র ‘ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’র জাতীয় কর্মশালা
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের কৃষিকে সময়োপযোগী ও টেকসই উন্নয়নের ধারায় আনতে হলে উৎপাদনকেন্দ্রিক কৃষির গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিক ও রফতানিমুখী কৃষিতে রূপান্তর ঘটাতে হবে বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা এ-ও জানান, কৃষিখাতে সঠিক ও বাস্তবসম্মত তথ্য উপস্থাপন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ভুল বা অতিরঞ্জিত তথ্য কৃষির বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই তথ্য ম্যানুপুলেশন নয়, বরং মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বক্তারা। একই সঙ্গে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, কল-কারখানা, বাড়িঘর ও সড়ক নির্মাণে আবাদি জমি দ্রুত কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিল্প-কারখানার দূষিত বর্জ্যে কৃষিজমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
বুধবার রাজধানীর ফার্মগেটের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে এক জাতীয় কর্মশালায় এসব বিষয় উঠে আসে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) ‘ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। ডিএই মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিমের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত সচিব মির্জা আশফাকুর রহমান, বিএআরসির চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম। এসময় ডিএইর সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুল ইসলাম মণ্ডলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার ড. শারমিন সুলতানার উপস্থাপনায় কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন জাকির হোসেন।
ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, আমাদের দুর্বলতা চিহ্নিত করেই সামনে এগোতে হবে। ফসল উৎপাদনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে, কোনোভাবেই তথ্য ম্যানুপুলেশন করা যাবে না। কৃষির তথ্য নিয়ে মানুষ যখন বলে ‘এসব সঠিক নয়’, তখন সেটি পুরো খাতের জন্য অশনিসংকেত। তাই কৃষি ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য দেয়ার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, কোনো উপকরণ বা প্রযুক্তি বিনামূল্যে দেয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে কৃষকের কাছ থেকে স্বল্প হলেও মূল্য নিতে হবে, কারণ বিনামূল্যে পাওয়া জিনিসের মূল্যায়ন থাকে না। পাশাপাশি বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে সঠিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সময়োপযোগী প্রকল্প গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। কৃষি সচিবের মতে, মাঠদিবস বা বড় কৃষক সমাবেশের নামে অর্থনির্ভর কার্যক্রমের প্রয়োজন নেই; বরং একজন কৃষি কর্মকর্তা মাঠে গিয়ে সীমিত সংখ্যক কৃষকের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করলেই বাস্তব ফল পাওয়া সম্ভব।
কৃষিকে প্রকল্পনির্ভর না হয়ে প্রয়োজনভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে সচিব বলেন, দেশের অর্থনীতিকে কৃষিকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত করতে হবে। সে জন্য কৃষিপণ্য রফতানির উপযোগী ফসল রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনের ওপর জোর দেন তিনি।
কর্মশালায় প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম মজুমদার| তিনি জানান, প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পে অর্থের পরিমাণ ১৪৫ কোটি টাকা। যার পুরোটাই সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, মাটি ও আবহাওয়া উপযোগী, স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ফসলের শস্যবিন্যাসভিত্তিক নিবিড় ও আধুনিক চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খাদ্য ঘাটতি হ্রাসকরণ, নিরবিচ্ছিন্ন পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বাণিজ্যিক কৃষি, উদ্যোক্তা তৈরি, মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থান ও কৃষকের আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো। প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হচ্ছে,বিদ্যমান শস্যের নিবিড়তা ১৯৫% থেকে ৪-৫% বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় ফসলের উৎপাদন ৭-৮% বৃদ্ধি; মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও লাগসই কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, উচ্চমূল্যের এবং স্বল্প পানি চাহিদার ফসল আবাদের মাধ্যমে বহুমুখী শস্য আবাদ এলাকা ১৮,৪৬,৫১৮ হেক্টর থেকে ২-৩% বৃদ্ধি এবং খাদ্য ঘাটতি ১৫% থেকে হ্রাস করে ১২% করা; ৩. প্রকল্প এলাকায় গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদিত উচ্চমূল্য ফসল ও চাহিদা ভিত্তিক কৃষিপণ্য প্যাকেজিং ও প্রসেসিং এবং বাজার সংযোগ স্থাপন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও খাদ্যের পুষ্টিমান উন্নয়ন; আয়বর্ধক কার্যক্রমে মহিলাদের অংশগ্রহণ ৩০% থেকে ন্যূনতম ৩-৪% বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন, নেতৃত্ব তৈরি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সচেতনতা বৃদ্ধি। তিনি রপ্তানিকারকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পটি ঢাকা বিভাগের ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীসহ ৮ জেলার ৫৮ থানা ও উপজেলায় বাস্তবায়ন হচ্ছে। ##